১২ বছরে কাজ কতটা? চিটফান্ড মামলায় কমিটির ভূমিকা নিয়ে হাই কোর্টের তীব্র প্রশ্ন

বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচের হিসাব, আমানতকারীদের ফেরত মাত্র ৯৬ কোটি! ১০৩টি সংস্থার সম্পত্তি ও টাকা ফেরতের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চাইল ডিভিশন বেঞ্চ

Published by -Jyotirmay Dutta: Posted 08.10.2026 at 20:10 pm

বঙ্গবার্তা নিউজ, কলকাতা,মৃণাল কান্তি সরকার:

ছবি এ আই দ্বারা নির্মিত এবং নিজস্ব

চিটফান্ডে প্রতারিত আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে উঠল একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। বিচারপতি এস পি তালুকদারের নেতৃত্বাধীন কমিটি গত ১২ বছরে ঠিক কী কাজ করেছে, কত সম্পত্তি উদ্ধার হয়েছে, কত জন আমানতকারী টাকা ফেরতের আবেদন করেছেন এবং তাঁদের মধ্যে কত জন টাকা পেয়েছেন—এই সমস্ত বিষয়ে বিস্তারিত হিসাব চেয়েছে আদালত।

শুনানিতে কমিটির কাজের গতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত জানতে চায়, এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেন সাধারণ আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হচ্ছে না। বিশেষ করে পাঁচ বা দশ হাজার টাকার মতো সামান্য অঙ্ক জমা রেখে সর্বস্বান্ত হওয়া সাধারণ মানুষের টাকা ফেরানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।

১২ বছরে খরচ কত, প্রশ্ন আদালতের

কমিটির ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে শুনানিতে। আদালতে উঠে এসেছে, গত ১২ বছরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা করে খরচের হিসাব ধরলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ১২০ কোটি টাকারও বেশি। অথচ আমানতকারীদের ফেরত দেওয়া হয়েছে মাত্র ৯৬ কোটি টাকা।

এই পরিস্থিতিতে এত বিপুল অর্থ খরচের যৌক্তিকতা কী, সেই প্রশ্নই তুলেছে আদালত। কমিটির ব্যয়ের পাশাপাশি কত টাকা উদ্ধার হয়েছে এবং তার কতটা আমানতকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে, তারও বিস্তারিত হিসাব চাওয়া হয়েছে।

১০৩টি সংস্থার সম্পত্তির হিসাব কোথায়?

চিটফান্ড মামলায় থাকা ১০৩টি সংস্থার অধীনে মোট কতগুলি কোম্পানি রয়েছে, তাদের সম্পত্তির পরিমাণ কত এবং সেই সম্পত্তির কতটা উদ্ধার বা বিক্রি করা হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য আদালতের সামনে পেশ করতে বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে কত জন আমানতকারী টাকা ফেরতের আবেদন করেছেন এবং তাঁদের মধ্যে কত জন ইতিমধ্যে টাকা পেয়েছেন, সেই পরিসংখ্যানও চেয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।

কমিটির হাতে ২৪ জন কর্মী এবং ১৩ জন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর থাকা সত্ত্বেও কাজের গতি কেন প্রত্যাশিত নয়, সেই প্রশ্নও শুনানিতে উঠে এসেছে।

ডুয়ার্সে ৫৪ কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রির অভিযোগ

শুনানিতে ভিবজিওর সংক্রান্ত সম্পত্তি বিক্রির অভিযোগও উঠে আসে। অভিযোগ, ডুয়ার্সে সংস্থাটির প্রায় ৫৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি ২০২৫ সালে বিক্রি হয়ে গেলেও সেই বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পরও কমিটির তরফে কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি।

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চিটফান্ড সংস্থাগুলির সম্পত্তি রক্ষা, বিক্রির প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ক্ষমতা প্রয়োগ করে দ্রুত কাজ শেষের নির্দেশ

আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট, শুধু ব্যয়ের হিসাব দিলেই হবে না। কত সম্পত্তি উদ্ধার হয়েছে, কত জন আমানতকারী টাকা পেয়েছেন এবং বাকি টাকা ফেরানোর জন্য কী পরিকল্পনা রয়েছে—তার বিস্তারিত হিসাব দিতে হবে।

কমিটির হাতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করিয়ে দিয়ে সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।

আগামী ১৯ নভেম্বর কমিটিকে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।

দীর্ঘ ১২ বছর ধরে চিটফান্ডে টাকা রেখে ফেরতের অপেক্ষায় থাকা হাজার হাজার আমানতকারীর কাছে আদালতের এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক দশকেরও বেশি সময় পরেও যদি টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে কমিটির কার্যকারিতা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং সাধারণ আমানতকারীদের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এখন নজর থাকবে, ১৯ নভেম্বরের রিপোর্টে আদালতের এই প্রশ্নগুলির কতটা উত্তর দিতে পারে কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *