রবীন্দ্র সদনের সংবর্ধনা মঞ্চে আবেগ, প্রতিবাদ ও মুক্তচিন্তার বার্তা; ধর্মীয় মৌলবাদ, বাকস্বাধীনতা, নারী অধিকার ও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নির্বাসিত লেখিকার।
Published by -Jyotirmay Dutta: Posted 01.08.2026 at 08:25 pm
বঙ্গবার্তা নিউজ, কলকাতা,সর্নিকা দত্ত:
ছবি এ আই দ্বারা নির্মিত এবং নিজস্ব
প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। ১৯ বছর পর আবারও নিজের প্রিয় শহর কলকাতায় ফিরলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শনিবার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আবেগঘন বক্তৃতায় তিনি স্মরণ করলেন নির্বাসনের বেদনা, একইসঙ্গে তুলে ধরলেন ধর্মীয় মৌলবাদ, রাষ্ট্রের ভূমিকা, নারী অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থান।
মঞ্চে উঠে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তসলিমা বলেন, “আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি। এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার প্রায় ১৯ বছর লেগেছে।” ২০০৭ সালে ধর্মীয় মৌলবাদীদের হুমকির মুখে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে হুমকির কাছে নতি স্বীকার করে, তখন শুধু একজন লেখক নন— নির্বাসিত হয় আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের নৈতিক সাহসও।
তাঁর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল, “ভয়ের কাছে আপোষ শান্তি আনে না, বরং পরবর্তী হুমকির ভিত্তি তৈরি করে।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আপোষ নয়, প্রয়োজন দৃঢ় অবস্থান।
কলকাতায় ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আয়োজকদের পাশাপাশি শুভানুধ্যায়ীদের ধন্যবাদ জানান তিনি। একইসঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিই না।”
তসলিমা জানান, তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, বরং নারী অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তচিন্তা এবং বাকস্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতেই কলকাতায় এসেছেন।
মৌলবাদ ও দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে কড়া বার্তা
বক্তব্যে তিনি ইসলামী মৌলবাদের কড়া সমালোচনা করেন। পাশাপাশি তথাকথিত প্রগতিশীল ও বামপন্থীদের একাংশের বিরুদ্ধেও তীব্র প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, অনেকেই নিজেদের জীবনে আধুনিকতার সুবিধা ভোগ করলেও মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় বিধানকে সমর্থন করেন।
তাঁর কথায়,
“যারা নিজেদের জন্য আধুনিকতা চান কিন্তু মুসলিম সমাজের জন্য চান মধ্যযুগীয় বিধান, তারা মুসলমানের সবচেয়ে বড় শত্রু। যারা নিজেদের মেয়ের স্বাধীনতাকে অধিকার বলেন, কিন্তু মুসলিম মেয়ের পরাধীনতাকে সংস্কৃতি বলেন, তারা মোটেও প্রগতিশীল নন।”
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে সওয়াল
বাংলাদেশে মুক্তচিন্তক ও ব্লগার হত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তসলিমা বলেন, সভ্য সমাজে মতের জবাব হওয়া উচিত যুক্তি, বই এবং আলোচনার মাধ্যমে— কখনও সহিংসতা বা নির্বাসনের মাধ্যমে নয়।
নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ভারত ও বাংলাদেশ— উভয় দেশেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, একই দেশের নাগরিকদের অধিকার ধর্মভেদে আলাদা হতে পারে না।
শেষে স্মৃতির শহরকে ভালোবাসার বার্তা
দীর্ঘ ১৯ বছরের বিচ্ছেদের পর কলকাতায় ফিরে আবেগঘন বার্তায় তসলিমা বলেন, “ইতিহাস যেমন মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, ইতিহাস তেমনি মনে রাখে কারা দরজা খুলেছিল।”
বক্তব্যের শেষে তাঁর হৃদয়স্পর্শী উপলব্ধি—
“শেষ পর্যন্ত কোন মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।”
দীর্ঘ নির্বাসনের পর এই প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র একজন লেখিকার ব্যক্তিগত আবেগের মুহূর্ত নয়, বরং মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রইল।

