পুরনো গাড়ির বেহাল দশা, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বৃদ্ধি ও ভাড়ার গাড়ির উপর চাপ—সব মিলিয়ে একলপ্তে ১৫১টি নতুন গাড়ি কেনার উদ্যোগ রাজ্য সরকারের
Published by -Jyotirmay Dutta: Posted 01.10.2026 at 15:07pm
বঙ্গবার্তা নিউজ, কলকাতা,মৃণাল কান্তি সরকার:
ছবি এ আই দ্বারা নির্মিত
প্রায় এক দশক পর একসঙ্গে বড় সংখ্যায় সরকারি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মন্ত্রী, আমলা এবং বিভিন্ন দফতরের শীর্ষ আধিকারিকদের ব্যবহারের জন্য মোট ১৫১টি নতুন গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই গাড়ি কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী দেড় মাসের মধ্যেই নতুন গাড়িগুলি রাজ্য সরকারের হাতে এসে পৌঁছতে পারে।
নবান্ন সূত্রের খবর, নতুন গাড়ির তালিকায় রয়েছে মাহিন্দ্রা স্করপিও এবং টয়োটার গাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কাজে ব্যবহৃত বেশ কিছু গাড়ির অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ায় নতুন গাড়ি কেনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতেই একলপ্তে ১৫১টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুরনো গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণেই বাড়ছিল খরচ
রাজ্য সরকারের হাতে থাকা প্রায় দু’শোর কাছাকাছি পুরনো গাড়ি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা তৈরি হচ্ছিল বলে নবান্ন সূত্রের দাবি। কোথাও আসন ভেঙে গিয়েছে, কোথাও আবার ঠিকমতো কাজ করছে না এসি। পুরনো গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের খরচও ক্রমশ বাড়ছিল। একই সঙ্গে জ্বালানি খরচও বেড়েছে।
এর ফলে মন্ত্রী ও শীর্ষ আধিকারিকদের সরকারি কাজে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত গাড়ির জোগান দিতে সমস্যা হচ্ছিল। অনেক ক্ষেত্রেই ভাড়ার গাড়ির উপর নির্ভর করতে হচ্ছিল বিভিন্ন দফতরকে।
কেন বৈদ্যুতিক গাড়ি নয়?
নতুন গাড়ি কেনার পরিকল্পনার সময় বৈদ্যুতিক গাড়ির বিষয়টিও বিবেচনায় এসেছিল বলে জানা গিয়েছে। তবে দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে চার্জিং পরিকাঠামো, মাঝপথে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, গাড়ির দাম এবং ব্যবহারের বিষয়গুলি বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত পেট্রোলচালিত গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রের খবর।
ভাড়ার গাড়ির চাপও অন্যতম কারণ
সরকারি দফতরের সঙ্গে যুক্ত গাড়ি সরবরাহকারী এবং পুলকার মালিকদের তরফেও দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া বাড়ানোর দাবি উঠছিল। বর্তমান ভাড়ায় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তাঁদের একাংশের দাবি ছিল। ভাড়া না বাড়ালে গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল বলে সূত্রের খবর।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি পরিবহণ ব্যবস্থার উপর চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারি গাড়ির জোগান নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নতুন গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।
টেন্ডার ও বরাতের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন
এক সরকারি আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ব্যবহৃত পুরনো গাড়ি নিয়ে নতুন মন্ত্রীদের একাংশের আপত্তি ছিল। তবে সরকারি গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই নিয়ম মেনেই টেন্ডার ডাকা হয়। অর্থ দফতরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়ার পর ইতিমধ্যেই বরাতের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
নতুন গাড়িগুলি হাতে আসার পর প্রতিটি গাড়ির নম্বর, কোন মন্ত্রী বা আধিকারিক ব্যবহার করছেন এবং ব্যবহারের যাবতীয় তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করবে নবান্ন। প্রয়োজন অনুযায়ী সেই তথ্য জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ, কলকাতা পুরসভা এবং কলকাতা পুলিশের সঙ্গেও ভাগ করে নেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।
আমলাদের সরকারি গাড়িতেও বদল, ‘ব’-এর বদলে অশোকচক্র
শুধু নতুন গাড়ি কেনাই নয়, সরকারি গাড়িতে উচ্চপদস্থ আমলাদের পরিচয় ও পদমর্যাদা প্রকাশের ব্যবস্থাতেও বদল আনা হয়েছে।
সরকার বদলের পর পশ্চিমবঙ্গের উচ্চপদস্থ আইএএস আধিকারিকদের সরকারি গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে এত দিন ব্যবহৃত ‘ব’ লেখা পতাকা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে নীল রঙের পতাকা এবং অশোকচক্রের লোগো।
নবান্নের নির্দেশিকা অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের আইএএস আধিকারিকদের সরকারি গাড়িতে নির্দিষ্ট ধরনের পতাকা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের সরকারি বৈঠক এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মসূচিতে আধিকারিকদের পদমর্যাদা ও পরিচয় স্পষ্ট করার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা বলে জানা গিয়েছে। আধিকারিকের পদমর্যাদা অনুযায়ী পতাকার নকশা ও আকৃতিতেও পার্থক্য রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রায় এক দশক পর একসঙ্গে ১৫১টি নতুন সরকারি গাড়ি কেনা এবং একই সঙ্গে আমলাদের সরকারি গাড়িতে পরিচিতির নতুন ব্যবস্থা—দুই সিদ্ধান্তেই রাজ্যের সরকারি গাড়ি ব্যবস্থাপনায় বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।

