পুরুলিয়ায় শিল্পের নতুন অধ্যায়,অমিত মেটালিক্সের ইন্টিগ্রেটেড স্টিল প্ল্যান্টের ভিত্তিপ্রস্তর

রঘুনাথপুরে ১.২ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতার প্রকল্প, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

Published by -Jyotirmay Dutta: Posted 17.08.2026 at 20:05 pm

বঙ্গবার্তা নিউজ, কলকাতা,মৃণাল কান্তি সরকার:

ছবি এ আই দ্বারা নির্মিত

পুরুলিয়ার শিল্প মানচিত্রে যোগ হল নতুন পালক। রঘুনাথপুরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে অমিত মেটালিক্সের ইন্টিগ্রেটেড স্টিল প্ল্যান্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হল সোমবার। প্রায় ১৫১ একর জমির উপর গড়ে উঠতে চলা এই বৃহৎ শিল্পপ্রকল্পের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১.২ মিলিয়ন টন। প্রকল্পকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্পের প্রসার অত্যন্ত জরুরি। পুরুলিয়ায় বড় শিল্প এলে শুধু কারখানা তৈরি হবে না, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। পাশাপাশি পরিবহণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিষেবা এবং অন্যান্য সহযোগী ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে বলে তাঁর বক্তব্য।

মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, পুরুলিয়ার স্থানীয় ছেলেমেয়েদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাঁর কথায়, শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল থেকে জল—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানই পুরুলিয়ায় রয়েছে। ফলে পুরুলিয়াকে শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উপর জোর দিতে হবে।

শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে জোর

মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী দিনে শিল্প সংক্রান্ত একাধিক নীতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে কোনও ভয় বা প্রশাসনিক সমস্যার মুখে না পড়েন, সেই পরিবেশ তৈরির উপরও জোর দেওয়া হবে। একইসঙ্গে পুরুলিয়ায় শিল্পায়নের অতীতের প্রসঙ্গ তুলে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সমস্যার জন্য আগের সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বলেন, রঘুনাথপুরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগকে স্বাগত জানাচ্ছে রাজ্য সরকার। আগামী দিনে এই বিনিয়োগ আরও বাড়ুক এবং উৎপাদন ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাক—এটাই সরকারের লক্ষ্য। শিল্পের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। নিজেকে ‘স্টার্টআপ মিনিস্টার’ হিসেবেও উল্লেখ করেন শিল্পমন্ত্রী।

শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবারের প্রসঙ্গ তুলে তাপস রায় বলেন, বাংলায় আগের মতো শিল্প ফিরে আসুক—শিবের কাছে সেই প্রার্থনাই তাঁরা করছেন। শিল্পের জন্য জমি, বাণিজ্যিক নীতি এবং বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

শিল্পপতিদের জন্য ভয়মুক্ত পরিবেশের বার্তা

এরপর বক্তব্য রাখেন পরিবহণ ও শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংহ। পুরুলিয়ার মাটিতে অমিত মেটালিক্সের এই বড় বিনিয়োগকে গৌরবের বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। শিল্পপতিরা যাতে ভয়মুক্ত পরিবেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরির উপর জোর দেন মন্ত্রী। শিল্পের বিকাশের জন্য আইনের শাসন এবং অনুকূল পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।

কী থাকছে অমিত মেটালিক্সের প্রকল্পে?

প্রায় ১৫১ একর জমির উপর গড়ে উঠবে অমিত মেটালিক্সের ইন্টিগ্রেটেড স্টিল প্ল্যান্ট। প্রকল্পে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • পেলেট প্ল্যান্ট
  • ডিআরআই ইউনিট
  • রোলিং মিল
  • ফোর্জিং ইউনিট
  • ইট তৈরির ইউনিট
  • ১৪৫ মেগাওয়াটের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট

২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

শুধু কারখানা নয়, বাড়বে স্থানীয় অর্থনীতিও

এই প্রকল্পকে ঘিরে সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবহণ, লজিস্টিক্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষেবা এবং ছোট-মাঝারি শিল্পেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একটি বড় শিল্পপ্রকল্পকে কেন্দ্র করে রঘুনাথপুর ও আশপাশের এলাকায় পরোক্ষ কর্মসংস্থান ও ব্যবসার পরিধি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় যুবকদের শিল্পক্ষেত্রে কাজের উপযোগী করে তুলতে পুরুলিয়ায় একটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে সংস্থার। এর ফলে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ করে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

পুরুলিয়ার শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনা

অমিত মেটালিক্সের এই প্রকল্প তাই শুধু ইস্পাত উৎপাদনের একটি কারখানা নয়, পুরুলিয়ার অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার একটি বড় উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থান, ছোট ব্যবসার প্রসার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সরাসরি যোগসূত্র—সব মিলিয়ে রঘুনাথপুরে নতুন শিল্প-অধ্যায়ের সূচনা হল।

পুরুলিয়ার মাটিতে এই বিনিয়োগ আগামী দিনে আরও শিল্পকে আকৃষ্ট করবে কি না, সেটাই এখন দেখার। তবে ৪ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা একটাই—শিল্প আসুক, কাজ আসুক, আর তার সুফল পৌঁছক পুরুলিয়ার ঘরে ঘরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *