রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে জয় গোস্বামীকে মঞ্চে উঠতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ব্যথিত তসলিমা নাসরিন। বললেন, ‘ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু কারও কণ্ঠরোধ গণতন্ত্রের পথ নয়।’ কবির বাড়িতে গিয়ে দেখা করারও ইচ্ছাপ্রকাশ লেখিকার।
Published by -Jyotirmay Dutta: Posted 02.08.2026 at 20:45 pm
বঙ্গবার্তা নিউজ, কলকাতা,সর্নিকা দত্ত:
ছবি এ আই দ্বারা নির্মিত
রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত ‘ফেরা’ অনুষ্ঠানে কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে উঠতে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কে মুখ খুললেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “জয়কে অপমান করা মানে আমাকেও অপমান করা। কারণ আমিই তাঁকে মঞ্চে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।”
প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে শনিবার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন তসলিমা নাসরিন। অনুষ্ঠানে তাঁকে সংবর্ধনা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বক্তব্য রাখতে গিয়ে দর্শকাসনে উপস্থিত কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে ডেকে নেন তিনি। কিন্তু কবি মঞ্চের দিকে এগোতেই দর্শকদের একাংশ প্রবল আপত্তি জানান এবং চিৎকার করে তাঁকে মঞ্চে উঠতে বাধা দেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় জয় গোস্বামী মাঝপথ থেকেই ফিরে গিয়ে নিজের আসনে বসে পড়েন।
“এটা শুধু জয় গোস্বামীর অপমান নয়”
এই ঘটনার প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন,
“গতকালের ঘটনায় আমার খুব খারাপ লেগেছে। এটা শুধু জয় গোস্বামীর অপমান নয়, আমারও অপমান। কারণ আমি তাঁকে ডেকেছিলাম।”
তিনি জানান, নিজের বক্তব্যে তিনি বারবার বাকস্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। তাই একজন কবিকে মঞ্চে কথা বলার সুযোগ না দেওয়াকে তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করেন।
“ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত নয়”
দর্শকদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখিকা বলেন, যারা তাঁর বক্তব্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে হাততালি দিয়েছেন, তাঁরাই আবার অন্য একজন কবিকে কথা বলতে দিতে চাননি—এই দ্বিচারিতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
তাঁর ভাষায়,
“আমাদের ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু সবাইকে কথা বলতে দিতে হবে। কারও কথা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, কলকাতা বরাবরই প্রগতিশীল চিন্তার শহর হিসেবে পরিচিত। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই প্রত্যাশাই করছেন তিনি।
জয় গোস্বামীর বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা
এই ঘটনার পর এখনও জয় গোস্বামীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়নি বলে জানান তসলিমা। তবে খুব শীঘ্রই কবির বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন বলেও জানান।
তিনি বলেন,
“আমি ভালোবেসেই তাঁকে মঞ্চে ডেকেছিলাম। রাজনৈতিক মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বড় কবি। এমন ঘটনা ঘটবে, তা ভাবিনি।”
রাজনৈতিক বিতর্কও তুঙ্গে
ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, তসলিমা নাসরিন যখন রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তখন ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট সরকার, আর এখন তিনি ফিরেছেন বিজেপি সরকারের আমলে। তবে বাকস্বাধীনতার কথা বলা একটি সভাতেই জয় গোস্বামীর মতো একজন কবিকে অপমানিত হয়ে ফিরে যেতে হওয়াকে তিনি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন।
বাকস্বাধীনতার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান
সাংবাদিক বৈঠকের শেষে তসলিমা নাসরিন আবারও স্পষ্ট করেন, মতাদর্শ ভিন্ন হলেও একজন মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকা উচিত। তাঁর মতে, সুস্থ গণতন্ত্রে ভিন্ন মতের মানুষের জন্যও সমান জায়গা থাকা প্রয়োজন। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ বজায় রাখাই সমাজের অগ্রগতির অন্যতম শর্ত।

