সরকারি দপ্তর, প্রশাসনিক নথি, এফআইআর থেকে সরকারি পোর্টাল—সব ক্ষেত্রেই বাধ্যতামূলক হচ্ছে বাংলা ভাষার ব্যবহার। পাশাপাশি ২১শে জুলাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের ঘোষণায় নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের ইঙ্গিত।
Published by -Trishna Dutta: Posted 20.07.2026 at 12:25 pm
বঙ্গবার্তা নিউজ, কলকাতা ,সর্নিকা দত্ত:
ছবি এ আই দ্বারা নির্মিত এবং নিজস্ব
পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আগামী ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি কাজকর্মে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে বলে বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন তিনি। সরকারি দপ্তর, প্রশাসনিক ফাইল, সরকারি চিঠিপত্র, এফআইআর, অভিযোগপত্র, অনলাইন পরিষেবা থেকে শুরু করে সরকারি ওয়েবসাইট—সব ক্ষেত্রেই বাংলাকে প্রাথমিক ভাষা হিসেবে কার্যকর করা হবে।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর সাম্প্রতিক বঙ্গ সফরের সময় একটি চিঠি দেন। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে লেখা সেই চিঠিতে সরকারি প্রশাসনে মাতৃভাষার ব্যবহার আরও বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“আগামী ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরে বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করা হচ্ছে।”
সরকারি দপ্তরে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ভূমি সংস্কার দপ্তর থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি সরকারি অফিসে বাংলায় ফাইল পরিচালনা, নথিপত্র তৈরি এবং সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি থানায় এফআইআর দায়ের, অভিযোগ নথিভুক্তকরণ, সরকারি পোর্টাল ও ওয়েবসাইটেও বাংলা ভাষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই বৃহৎ প্রশাসনিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুবাদক নিয়োগ, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো এবং সফটওয়্যার ব্যবস্থাও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগে বাংলা, সঙ্গে থাকবে হিন্দি অনুবাদও
রাজ্যের অভ্যন্তরে বাংলা বাধ্যতামূলক হলেও কেন্দ্রীয় সরকার বা অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সরকারি যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য একই চিঠির হিন্দি অনুবাদও সংযুক্ত করা হবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“ভারত সরকার বা অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে আমরা বাংলা ভাষায় চিঠিপত্র করব। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী হিন্দি ভাষাতেও উত্তর ও সরকারি যোগাযোগ বজায় থাকবে।”
সরকারি সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই অনুবাদ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রের বহুভাষিক অনুবাদ সফটওয়্যার ‘ভারতী’-র ব্যবহার করা হতে পারে।

২১শে জুলাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের ঘোষণা
ভাষা সংক্রান্ত ঘোষণার পাশাপাশি বিধানসভায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেন, বিগত সরকারের আমলে গঠিত ২১শে জুলাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে।
প্রাক্তন বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। তাঁর দাবি, কমিশনের রিপোর্টে যা সুপারিশ করা হয়েছিল, তার কতটা কার্যকর হয়েছিল, সেই তথ্য-প্রমাণ জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলা ভাষাকে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে আনার সিদ্ধান্ত যেমন বাঙালির ভাষা-আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা বহন করছে, তেমনই ২১শে জুলাই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের ঘোষণা বিরোধী রাজনীতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
এখন নজর থাকবে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রশাসনিক স্তরে বাংলা ভাষার এই বাধ্যতামূলক প্রয়োগ কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তার প্রভাব রাজ্যের প্রশাসন ও রাজনীতিতে কতটা পড়ে।

